কি আছে পৃথিবীর গভীরতম গর্তে?

পৃথিবী এমন একটা গ্রহ যার বিশ্বয় এর কোন শেষ নেই। এর সৃষ্টি লগ্ন থেকে আজ অব্দি বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত ।আর এর সঙ্গে সঙ্গে রহস্যময় অনেক সৃষ্টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে ।  কিন্তু এসব প্রাকৃতিক রহস্যময় জায়গা সৃষ্টির বাইরে আরও অনেক আশ্চর্যজনক জায়গা রয়েছে যা মানুষের সৃষ্টি । এমনই একটা মানব সৃষ্ট আশ্চর্যজনক জায়গা হল কোলা সুপারডিপ বোরহোল ।

যা কৃত্রিম পৃথিবীর গভীরতম গর্ত হিসেবে পরিচিত এবং এই গর্তটি করার পর বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে এমন কিছু দেখতে পেয়েছে যা দেখে বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে গিয়েছে । আর আজকে  আমরা জানতে চলেছি সুপারডিপ বোরহোল এর রহস্য । যা জানলে আপনার জাহান্নাম কেমন হবে তা পুরোপুরি ভাবে বুঝতে পারবেন । কারণ এর মাধ্যমেই নরকের দরজা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল ।

বন্ধুরা আমরা জানি যে সমুদ্র অনেক গভীর হয়ে থাকে এবং সমুদ্রের নিচে মানুষের খুজেঁ পাওয়া গভীরতম স্থান টির নাম হল প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 10 হাজার 994 মিটারে গভীর অবস্থিত। কিন্তু পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম গর্ত টির সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 12262 মিটার নিচে অবস্থিত। এর নাম কোলা সুপারডিপ বোরহোল ।

কোলা সুপারডিপ বোরহোল

1917 সালে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা ড্রিলিং এবং মাইনিং নিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। যা পরবর্তীকালে মানব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। রাশিয়ার পেনিনসুলা তে একটি বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট শুরু করা হয়। প্রজেক্ট এর উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর গভীরে যতটা সম্ভব পৌঁছানো । 1970 সালের 24 এপ্রিল প্রযুক্তি শুরু করা হয় । টানা 20 বছর ধরে ড্রিলিং কার্য সম্পন্ন করার পরে গর্তটি 12262 মিটার পর্যন্ত ড্রিলিং করা সম্ভব হয়।

বর্তমান সময়ে তথ্য অনুযায়ী এটি পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম মানবসৃষ্ট কৃত্রিম গর্ত । স্বাভাবিকভাবেই এটি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে জায়গা করে নিয়েছে। এই এত বড় গর্তের বেস্ ২৩ সেন্টিমিটার । এই প্রোজেক্টের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য ছিল 15 হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করা।

কিন্তু বিজ্ঞানীদেরকে 12262 মিটার গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছানোর পরে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা সম্মুখীন হতে হয়। 100 ডিগ্রি সেলসিয়াস এর পরিবর্তে অনুভূত হয় 180 ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা। তাই এরপরে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছে যে এত গভীর গর্ত করা মোটেও সহজ কাজ নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এত বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই গভীর গর্ত খনন করতে করতে কি কি তথ্য পেয়েছেন। এর মধ্যে কি কোন রহস্যের পর্দা উন্মোচিত হলো । এটা শুনতে কেমন যেন রোমানচোকর লাগছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন তারা গর্ত খনন করতে গিয়ে তিনটি জিনিসের সন্ধান পেয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ৫ জাহাজ

আর পানি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তারা বলেছেন এখানে পাথরের মজুদ খনিজ পদার্থের কথা । যা হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন কে জলে রূপান্তরিত করতে বাধ্য করে। এরপরে তারা বলেছেন সুক্ষ  জীবদের কথা । যাদের অস্তিত্ব 6700 মিটার গভীর খুঁজে পাওয়া গেছে। আর বিজ্ঞানীদের কথা মতে ওই গর্তে এটা সবথেকে অদ্ভুত জিনিস । এত গভীরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা স্বাভাবিক ভাবেই সম্ভব নয় । তাই এই সূক্ষ্ম জীবদের উপস্থিতিতে বিজ্ঞানীদেরকে ভাবিয়ে তোলে । এর একটা কারণ অবশ্যই তাপমাত্রা ।

কারণ মাটির যত গভীরে যাওয়া যায় এর তাপমাত্রা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই এই তাপমাত্রায় কোন জীবের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয় কিন্তু বিজ্ঞানীদের এই ধারণা সম্পূর্ণরূপে ভুল প্রমাণিত হয়। কারণ এই গর্তে অনেক তাপমাত্রায় সব সুক্ষ জীব খুঁজে সন্ধান মেলে । আর এই সমস্ত মাইক্রো গর্তের ভিতর পাথর টুকরোতে পাওয়া গিয়েছে।

এই পাথরগুলো কোটি কোটি বছরের পুরোনো ।  তিন নম্বরটি হলো বিজ্ঞানীরা এই গর্ত খনন করার সময় অত্যাধিক তাপমাত্রা সম্মুখীন হন । এই তাপমাত্রা ছিল 180 ডিগ্রি সেলসিয়াস । পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছানো ছিল বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য । কিন্তু এত বছর ধরে খনন করার পরেও পৃথিবীর মাত্র শূন্য দশমিক 2 শতাংশ গভিরে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এছাড়াও তারা আরো অনেক কিছু খুঁজে পাই । কিন্তু হঠাৎ করেই গর্ত খনন করার কাজ বন্ধ করে দেয়া হয় । আর এর পেছনে অনেক কারণের কথা জানা গিয়েছে । যার মধ্যে একটি অন্যতম কারণ হলো অত্যধিক তাপমাত্রা।

এর মধ্যে কাজ করা বিজ্ঞানীদের কাছে বিপদজনক বলে মনে হয়েছিল । আরো কারণ হলো পাথরের ঘনত্ব । গর্তের যত গভীরে যাওয়া হচ্ছিল পাথরের ঘনত্ব ততোই বাড়ছে। ফলে ডিলিং এর কাজটি অত্যন্ত অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল 15 কিলোমিটার । আর তাই তারা ভেবে নিয়েছিলেন এত গভীর গর্ত খনন করতে গেলে উষ্ণতা 350 ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে। আর এই তাপমাত্রায় কোন ড্রিল মেশিনের কাজ করবে না । তাই 2006 সালে এই প্রজেক্টটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়।

এর সাথে ডিলিং এর সমস্ত উপকরণ গুলি কেউ নষ্ট করে দেয়া হয় । যাতে করে অন্য কেউ এই প্রজেক্টটি আবার শুরু করতে না পারে। এই সাইটটিকে 2008 সালে পুরোপুরিভাবে সিল করে দেয়া হয় । আপনাদেরকে জানিয়ে রাখি পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম স্থানের পৌঁছাতে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বারবার চেষ্টা করেছে। যার মধ্যে আমেরিকা জার্মানি এবং রাশিয়ার নাম রয়েছে। 15 কিলোমিটার পর্যন্ত খনন করার উদ্দেশ্য কখনো সফল হবেনা কিন্তু যতদূর পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে ততদূর পর্যন্ত করেই এই সমস্ত দেশ বিভিন্ন রহস্যের সন্ধান পেয়েছে।

যা এখনও অনেকেই জানেননা । কোলা সুপারডিপ বোরহোল এর সব থেকে আশ্চর্যজনক তথ্য হলো এটি বন্ধ করতে অনেক শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছিল। এই জায়গাটি এখন পুরোপুরি ভাবে বন্ধ । এখন কোন ব্যক্তি এখানে প্রবেশ করতে পারে না । গর্তটি বন্ধ করার সাথে সাথে এটি সম্পূর্ণভাবে সিল করে দেয়া হয়। যাতে অন্য কেউ এ প্রজেক্ট আবার শুরু করতে না পারে।

বন্ধুরা এতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা কোলা সুপারডিপ বোরহোল সম্পর্কে ততটা জানতে পারলেন যতটা সরকার সে দেশের জনগণকে জানিয়েছে। কিন্তু এর পেছনে মস্ত বড় এক আলাদা রহস্য রয়েছে । বিজ্ঞানীরা এই প্রজেক্ট বন্ধ করার যে কারণ দেখিয়েছে তা হল অত্যাধিক উষ্ণতা । কিন্তু এই প্রজেক্টটি বন্ধ করার পেছনে মূল কারণ সাধারণ জনগণকে জানতে দেয়া হয়নি।

বিভিন্ন বিশ্লেষণ এর তথ্য অনুযায়ী এ গভীর গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে বিজ্ঞানীরা নরক বা জাহান্নামের সন্ধান পেয়ে যায়। সেখান থেকে মানুষের আর্তনাদ এবং বিভিন্ন ভয়ংকর শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। গর্তটি মূলত এ কারণেই বন্ধ করে দেয়া হয় । আর হয়তো বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন যে গর্তটি শেষ পর্যন্ত নরককে গিয়ে পৌঁছবে। রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা এই সুপারডিপ খনন করার সময় ড্রিল মেশিনের সাথে মাইক্রোফোন যুক্ত করে রেখেছিলেন । যাতে পৃথিবীর অভ্যন্তরের আওয়াজ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।

কিন্তু তারা সম্মুখীন হন ভয়ঙ্কর চিৎকার এবং অদ্ভুত কিছু আর্তনাদের । যাকে সাউন্ড অফ হেল বা জাহান্নামের আওয়াজ ও বলা হয়। তাদের ধারণা অনুযায়ী আওয়াজ পাতালের অভ্যন্তরে অবস্থিত নরকের আওয়াজ। মানুষ জানোয়ার এবং রাক্ষস দের আর্তনাদের আওয়াজ ।

এই অদ্ভুত আওয়াজ শুনে মনে হয় কেউ যেন মানুষের উপরে নির্মম অত্যাচার করছে। কিন্তু বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা একে অতিপ্রাকৃতিক তথ্য হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে পৃথিবীর অভ্যন্তরের লাভাস্রোত চলাচলের জন্য এই আওয়াজ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ বাইরে থেকে পৃথিবী কে দেখে শান্ত মনে হলেও পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ এখনো অশান্ত । পৃথিবীর অভ্যন্তরের সব সময় মেঘমা এবং লাভা হচ্ছে।

হতে পারে এটা তারই আওয়াজ । কিন্তু খুব সহজেই এই যুক্তি মেনে নেওয়া সম্ভব নয় । কিন্তু এই রেকর্ডটি শুনলে কোনোভাবেই এটা মনে হয় না যে ওটা ফ্লাইট চলাচল এবং লাভার স্রোতের কারণে তৈরি হচ্ছে । বরং হাজার হাজার মানুষকে এক জায়গায় বন্দি করে রেখে অমানবিক অত্যাচার করলে যে আওয়াজ বেরয়োনো সম্ভব যেন ঠিক তার মতোই। দত্তাকার কোন প্রাণীর অদ্ভুত হাসি এবং মানুষের আর্তনাদ শোনা যায় ।

Leave a Comment